
নিজস্ব প্রতিবেদন
চট্টগ্রামেরআঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিংবদন্তি কৌতুক অভিনেতা দিলীপ হোড়, যিনি সর্বসাধারণের কাছে ‘মেরা মিয়া’ নামেই সমধিক পরিচিত। সত্তর দশক থেকে শুরু করে দীর্ঘ চার দশক ধরে তিনি নিজের অনন্য অভিনয়শৈলী আর হাস্যকৌতুকের মাধ্যমে কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।
শৈশব ও অভিনয় জীবনের উন্মেষ
১৯৫৫ সালে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার আলামপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই গুণী শিল্পী। পটিয়া, যা বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের জন্মস্থান হিসেবেও পরিচিত, সেখানেই বেড়ে ওঠা দিলীপ হোড়ের। ১৯৭৬ সালে মঞ্চনাটকের মাধ্যমে তাঁর অভিনয় জীবনের যাত্রা শুরু হয়।
‘মেরা মিয়া’ হয়ে ওঠার গল্প
মঞ্চে অভিনয়ের শুরুর দিকেই “মিডা চুনচুন্যার কেরামতি” নাটকের অভাবনীয় সাফল্য তাঁকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে। পরবর্তীতে ‘মেরা মিয়া’ এবং ‘মিডা চুনচুন্যা’ চরিত্র দুটি চট্টগ্রামের লোকসংস্কৃতির আইকনিক চরিত্রে পরিণত হয়। তাঁর সাবলীল সংলাপ প্রক্ষেপণ এবং আঞ্চলিক ভাষার রসবোধ তাঁকে চট্টগ্রামের ঘরে ঘরে জনপ্রিয় করে তোলে।
রুপালি পর্দা ও ছোট পর্দায় দাপট
মঞ্চনাটকের গণ্ডি পেরিয়ে নব্বইয়ের দশকে মেরা মিয়া নাম লেখান চলচ্চিত্রেও। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য কিছু চলচ্চিত্র হলো:
আশিক প্রিয়া
দরদী সন্তান
রাজা গুণ্ডা
চরম আঘাত
মহা শক্তি
এছাড়া টেলিভিশন টক শো ‘কথায় কথায়’ এবং অসংখ্য আঞ্চলিক বিজ্ঞাপনে তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের বিনোদনের খোরাক জুগিয়েছে। তাঁর অঙ্গভঙ্গি এবং অভিব্যক্তি ছিল এক কথায় অনন্য, যা চট্টগ্রামের কৌতুক ধারাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
ব্যক্তিগত জীবন ও প্রয়াণ
১৯৯৪ সালে তিনি খাগড়াছড়ির মেয়ে মীনা হোড়ের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ব্যক্তিজীবনে তিনি এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক। জীবনের শেষ দিনগুলোতে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা তাঁকে কিছুটা কাবু করলেও অভিনয়ের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর বিচরণ ছিল আজীবন।
সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার
মেরা মিয়া কেবল একজন অভিনেতাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার একজন অঘোষিত দূত। তাঁর অভিনয় পরবর্তী প্রজন্মের কৌতুক অভিনেতাদের জন্য একটি আদর্শ পাঠশালা হিসেবে কাজ করছে। চট্টগ্রামের লোকজ সংস্কৃতিকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করতে তাঁর অবদান ইতিহাসের পাতায় অম্লান হয়ে থাকবে।
“মেরা মিয়া আমাদের চট্টগ্রামের মাটির শিল্পী। তাঁর অভিনয় আমাদের হাসিয়েছে, কাঁদিয়েছে এবং আমাদের নিজস্ব ভাষার শক্তিকে চিনিয়েছে।” — স্থানীয় এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।