‘নীরবতা ভেঙে’ মাঠে জামায়াত প্রার্থী, অস্বস্তিতে এনসিপি

‘নীরবতা ভেঙে’ মাঠে জামায়াত প্রার্থী, অস্বস্তিতে এনসিপি

 ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ | ১২:৩৯ অপরাহ্ণ

জুমার নামাজ শেষ হয়েছে সবে। মুসল্লিরা মসজিদ থেকে একে একে বের হচ্ছেন। ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ান ডা. মো. আবু নাছের। হাসিমুখে ভোট প্রার্থনা করলেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের জন্য। সমর্থকেরা সবার হাতে তুলে দেন লিফলেট।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে নগরের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে এভাবেই দেখা মিলল চট্টগ্রাম-৮ আসনের (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) জামায়াত প্রার্থীকে। সেখানে প্রচারণা শেষে তিনি গণসংযোগ করতে চলে যান কর্ণফুলী নদীর ওপারে বোয়ালখালীতে। এটি একদিনের দৃশ্য নয়। প্রায় দুই সপ্তাহের নীরবতা ভেঙে ৩১ জানুয়ারি থেকেই মাঠে সক্রিয় আবু নাছের। তার এই ‘ফেরায়’ জামায়াতের নেতাকর্মীরা উচ্ছ¡সিত হলেও ‘মন খারাপ’ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমর্থকদের। কারণ, ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যে এই আসনটি ছেড়ে দিয়েছিল এনসিপির জোবাইরুল হাসান আরিফকে। তবে জামায়াতের প্রার্থী আবু নাছের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করলেও দলীয়ভাবে এনসিপিকে সমর্থনের ঘোষণা আসে। এমনকি ২ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান চট্টগ্রাম নগরের জনসভায় এনসিপির প্রার্থীর হাতে শাপলা কলি তুলে দেন। তবে মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। বিরতি দিয়ে আবার দাঁড়িপাল্লার প্রচারণায় নেমেছেন আবু নাছের। যদিও জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সমর্থকদের চাপে মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছেন তাদের প্রার্থী। অবশ্য আবু নাছের মাঠে না থাকার সময়গুলোতে ‘বিক্ষুব্ধ’ সমর্থকেরা তার পক্ষে নিয়মিত কর্মসূচি পালন করে আসেন। এমন টানাপোড়েনে প্রশ্ন উঠছে-এই আসনটি কি জামায়াত-এনসিপি দুই প্রার্থীর জন্যই উন্মুক্ত থাকছে?

জামায়াত কেন ছাড়ছে না: একসময় বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম-৮ আসনের দিকে শুরুতে জামায়াতের দৃষ্টি ছিল কম। এই আসনটিকে দলটি ‘সি ক্যাটাগরি’ হিসেবেই চিহ্নিত করেছিল। জামায়াতের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবু নাছেরের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও সংগঠনের মাঠ পর্যায়ের তৎপরতায় আসনটি এখন তাদের কাছে অন্যতম ‘সম্ভাবনাময়ী’। বিপরীতে এনসিপি প্রার্থী স্থানীয় না হওয়ায় পরিচিতি কম, দলের সাংগঠনিক শক্তি তুলনামূলক দুর্বল। জামায়াতের আশঙ্কা আবু নাছের না থাকলে আসনটি কার্যত বিএনপির জন্য ছেড়ে দেওয়া হবে।

‘ভেস্তে যায়’ সমঝোতা: ২৬ জানুয়ারি এনসিপির প্রধান নাহিদ ইসলামের চট্টগ্রাম সফরের দিন নগরের একটি হোটেলে জামায়াত নেতাদের সঙ্গে তার রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে জামায়াত নেতারা নাহিদকে জানান, এনসিপির প্রার্থী চট্টগ্রাম-৮ আসনে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নেই। তারা মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, ডা. আবু নাছেরের দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক শক্তির বিষয়টি তুলে ধরেন। একইদিন কুমিল্লাতেও এনসিপি ও জামায়াত নেতাদের আরেক দফা বৈঠক হয়। সেখানেও একই বিষয় উঠে এলেও চ‚ড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

জোবাইরুল হাসান আরিফের সঙ্গেও একাধিক বৈঠকে জামায়াত নেতারা দুই প্রস্তাব দেন-আবু নাছেরকে সমর্থন দিয়ে আসনটি ছেড়ে দেওয়া অথবা আসন উন্মুক্ত রাখার বিষয়টিতে তিনি যেন সায় দেন। জামায়াতের নেতারা জানিয়েছেন, এই দুই প্রস্তাবের যে কোনো একটি বিষয়ে আরিফ ৩০ জানুয়ারি সিদ্ধান্ত জানাবেন এমনটা আলোচনা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত জামায়াত নেতাদের ‘সরি’ বলে দেন আরিফ। এরপরই জামায়াতের স্থানীয় নেতারা সিদ্ধান্ত নেন আবু নাছেরও মাঠে থাকবেন। সেই সিদ্ধান্তেই ৩১ জানুয়ারি থেকে প্রচারণায় নামেন এই প্রার্থী।

কি বলছে দুই পক্ষ: জামায়াতের নগর শাখার এসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মোরশেদুল ইসলাম বলেন, ‘সংগঠনের সিদ্ধান্তে আমাদের দ্বিমত নেই। কিন্তু আবু নাছের ভাইয়ের প্রতি মানুষের ভালোবাসাকে তো আমরা বাধা দিতে পারি না।’

ডা. আবু নাছের পূর্বকোণকে বলেন, ‘সংগঠনের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে আমি অন্তত ১০ দিন ঘরেই ছিলাম। কিন্তু জনগণই আমাকে ঘর থেকে বের করে এনেছেন।’

এনসিপি প্রার্থী জোবাইরুল আরিফের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে দূরত্ব ভুলে নরসিংদী-২ আসনে শাপলা কলির হয়ে জামায়াত প্রার্থীর প্রচারণায় নামা নিয়ে এনসিপি প্রার্থী সারোয়ার তুষারের ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসটি শেয়ার করেছেন জোবাইরুল। অনেকে বলছেন এর মাধ্যমে তিনি জামায়াতের প্রার্থীকে একটা বার্তা দিতে চেয়েছেন। তবে সেই সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।