সমাজসেবায় নতুন ধারা

সমাজসেবায় নতুন ধারা
আব্দুল মুবিন

সমাজসেবায় নতুন ধারা

নগরীর রৌফাবাদ বস্তির সরু গলিতে সন্ধ্যা নামলেই জোসনা আক্তারের চোখে যেন ভর করতো গভীর অন্ধকার। এক চিলতে ঘরে শয্যাশায়ী অসুস্থ স্বামী আর তিনি। তিন ছেলে থাকলেও কেউই নেই ভরসা হয়ে দাঁড়ানোর মতো। বড় ছেলে বিদেশ গিয়ে দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত। ছোট দু’জনের সামান্য যে আয়, তা দিয়ে নুন আনতে পান্তা ফুরায় দশা। এক বছর আগে স্বামীর চিকিৎসার জন্য নেওয়া বড় অংকের ঋণের চাপ ষাটোর্ধ্ব জোসনার জীবনকে ঠেলে দিয়েছে চরম অসহায়ত্বের দিকে। মানুষের বাসায় কাজ করে যে আয়, তাতে পেট চলে না; সেখানে মাসে ১৫ হাজার টাকার সুদ শোধ করতে গিয়ে চোখে সরষে ফুল দেখছিলেন এই নারী। ঠিক সেই সময়ে আশার আলো হয়ে আসেন ‘মোজাহের ভাই’! শোধ করে দেন জোসনার একজীবনের ঋণ, আড়াই লাখ টাকা। কান্না মুছে হাসি ফোটে জোসনার মুখে।

একসময় ফেসবুক মানেই ছিল নিছক ছবি-স্ট্যাটাস আর বিনোদন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্লাটফর্মটি হয়ে উঠেছে কারও কারও কাছে মানবসেবার শক্তিশালী হাতিয়ার। স্ক্রিনের ওপার থেকে বাস্তব জীবনের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গল্প লিখছেন একদল কনটেন্ট ক্রিয়েটর। কখনও তারা ফেসবুক থেকে আয়ের একটা অংশ তুলে দিচ্ছেন, কখনও বা তাদের অনুরোধে অসহায়দের পাশে সহায়তার হাত বাড়াচ্ছেন অনেকে। এই তাদেরই একজন চট্টগ্রামের মোজাহের ইসলাম, সবার কাছে যিনি মোজাহের ভাই নামেই পরিচিত। এই মুহূর্তে দেশের অন্যতম শীর্ষ এই কনটেন্ট ক্রিয়েটরকে শুধু ফেসবুকেই অনুসরণ (ফলোয়ার) করেন প্রায় ৭৯ লাখ মানুষ।

২০১৮ সালে এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হতেই ফেসবুকে কনটেন্ট তৈরির পথে নামেন মোজাহের। ‘এক্সিলেন্ট বøগ’ নামে পেজ খুলে শুরু। প্রথমে তেমন কেউ তার ভিডিও দেখেনি। পরে কিস্তিতে ব্যবহৃত ল্যাপটপ কেনার অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি ভিডিও বানিয়ে পেজে দিতেই মুহূর্তেই সেটি লুফে নেন দর্শকেরা। সেখান থেকেই মোজাহের খুঁজে পান তার পথ। এরপর করোনার দিনগুলোতে মানুষের পাশে দাঁড়ানো নিয়ে নানা ভিডিও বানাতে শুরু করেন এই তরুণ। শুরু হলো পুরনো পেজ মুছে ‘মোজাহের ভাই’ নামে নতুন যাত্রা। এখন তিনি ফেসবুক থেকে আয়ের বড় একটা অংশ তুলে দিচ্ছেন অসহায় মানুষদের হাতে। ‘জনসেবায়’ আলোচিত আরেক কনটেন্ট ক্রিয়েটর মো. আহসান হাবীব জুয়েল। এই তরুণের কাজের ক্ষেত্র চট্টগ্রামে হলেও জন্ম জামালপুরে। যমুনা পাড়ের এই সন্তানের কাজের সূত্রে পাঁচ বছর আগে বন্দরনগরীতে আসা। ফেসবুকে তার পেজের নাম ‘ব্রেন মেসেজ ০০১’। তাকে অনুসরণ করে (ফলোয়ার) প্রায় ৪৭ লাখ। মানুষের ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে তার পেজটি।

রমজানের এক মধ্যরাতে গোলপাহাড় এলাকায় ভাসমান মানুষদের জন্য সেহেরি বিতরণ করতে গিয়ে জুয়েল জানতে পারেন, প্রায় ৫০ হাজার টাকা বকেয়া বিলের কারণে একটি বেসরকারি হাসপাতালে আটকে রাখা হয়েছে এক রিকশাচালকের মরদেহ। পরে তিনি হাসপাতালটিতে গিয়ে বিল কমানোর অনুরোধ করলেও সাড়া মেলেনি। শেষ পর্যন্ত বকেয়া টাকার পুরোটাই শোধ করে ওই রিকশাচালকের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন তিনি।

ফেসবুকের মাধ্যমে বহুদিন ধরে মানুষকে সতর্ক করার পাশাপাশি অসহায়দের দুঃখ-দুর্দশা তুলে আসছেন কায়সার আলী চৌধুরীও। সম্প্রতি তারই উদ্যোগে এক ছোট্ট শিশুর নিভে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা জীবন যেন রক্ষা পায়! টাকার অভাবে কেমোথেরাপি নিতে পারছিল না নগরীর সদরঘাটের মালুম মসজিদ এলাকায় বাবা-মায়ের সঙ্গে বসবাস করা দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল মাওয়া। এ নিয়ে ফেসবুকে একটি ভিডিও আপলোড করেন কায়সার। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে ভিডিওটি। অনেকেই বাড়িয়ে দেন সহায়তার হাত। খুলে যায় জান্নাতুল মাওয়ার কেমোথেরাপি নেওয়ার পথ।

কায়সার আলী চৌধুরী পূর্বকোণকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে শুধু ব্যক্তিগত যোগাযোগ নয়, মানুষের জন্যও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছি। আমার ভিডিও বা স্ট্যাটাসের পর একজন অসহায় ব্যক্তি যখন সহায়তা পান তখন খুব ভালো লাগে।

তবে কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের এই মানবিক পথচলা মোটেও ঝামেলামুক্ত নয়। অনেক সময় কোন সতর্কতা ছাড়াই পেজ মুছে দেওয়া হয়, বন্ধ হয়ে যায় আয়ের পথ। আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রতারণার অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েন কনটেন্ট ক্রিয়েটররাও। এই জায়গায় রাষ্ট্রের নজরদারি ও নীতিগত সহায়তা জরুরি বলে মনে করেন কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। সরকার পাশে থাকলে যেমন প্রকৃত কনটেন্ট ক্রিয়েটররা সুরক্ষিত থাকবেন, তেমনি নিশ্চিত হবে- একটি লাইক, একটি শেয়ার কিংবা একটি ভিডিও আর কয়েক মিনিটের বিনোদন হয়ে থাকবে না, হয়ে উঠবে কারও বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়।