
গিটারের তারে ঝরে পড়া সুর থেমে গেছে বহুদিন আগেই। নিভে গেছে মঞ্চের আলো। করতালির ঢেউও আজ স্তব্ধ। তবু একজন মানুষের স্মৃতির ভেতর তিনি এখনো জীবন্ত-অদৃশ্য পায়ের শব্দে, গিটারের কাভারের গন্ধে, আর মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে ওঠা এক অপার শূন্যতায়! উপমহাদেশের প্রবাদপ্রতীম গিটারবাদক আইয়ুব বাচ্চুকে একুশে পদকে সম্মানিত করার দিনে পুরনো সব কথাই ভিড় করে আসে তার জীবনের চিরসাথী স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনার মনে। দিনটি তার কাছে শুধু গর্বের নয়, গভীর এক নিঃশব্দ ব্যথারও। কারণ-শিল্পী যে আর পৃথিবীর আলো-হাওয়ায় নেই।
বৃহস্পতিবার বিকেলে মরণোত্তর দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন চট্টগ্রামের কীর্তিমান সন্তান কিংবদন্তি শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু। এই স্বীকৃতির দিনে পূর্বকোণ কথা বলেছে তাঁর স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনার সঙ্গে। তিনি উজাড় করে বললেন সব-মঞ্চের তারকা নয়, ঘরের মানুষ আইয়ুব বাচ্চুর গল্প। যেখানে ভালোবাসা আছে, সংগ্রাম আছে, আর আছে এমন এক শূন্যতা, যা কোনো পদক দিয়ে ভরবে না।
কদিন ধরে জ¦র। শরীরটা ক্লান্ত। ফোনটা শব্দহীন করে শুয়ে ছিলেন ফেরদৌস আক্তার চন্দনা। এর মধ্যেই একের পর এক কল। পরে একটা ফোন ধরতেই ওপারে থাকা সাংবাদিক জানালেন সেই সুখবর। ফেরদৌস আক্তার চন্দনা বলেন, ‘ওই মুহূর্তে আমার চোখ দিয়ে পানি চলে আসে। যার এটি শোনার কথা, সে তো দুনিয়ায় নেই। ও শুনলে কি যে খুশি হতো। আপনাদের চট্টগ্রামের সন্তান এই সম্মান পেলো। নিশ্চিত ও বেঁচে থাকলে চিটাগংয়ের মানুষকে মেজবান খাওয়াইতো। কারণ এটি বিশাল একটা রাষ্ট্রীয় পদক। আর ওর মনপ্রাণ জুড়ে ছিল চট্টগ্রাম।’
কদিন ধরে সরকারের বিভিন্ন স্তর থেকে আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে নানা তথ্য জানতে চাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু তখনো বিষয়টির গুরুত্ব বোঝেননি ফেরদৌস চন্দনা। ভাবেননি, এই খোঁজখবরই বড় কোনো স্বীকৃতির পূর্বাভাস।
অবশ্য আইয়ুব বাচ্চু ‘প্রাপ্য পুরস্কারটা’ জীবদ্দশায় না পাওয়ায় একটু মন খারাপ চন্দনার। বললেন, ‘শিল্পীরা নিজের হাতে সম্মানটা নিতে পারলে সবচেয়ে বেশি খুশি হন। শিল্পীর হাতে স্বীকৃতি তুলে দেওয়াটা জরুরি। এতে তারা নতুন করে কাজের শক্তি পান, উৎসাহ পান। তারপরও আলহামদুলিল্লাহ-মৃত্যুর পর হলেও পেয়েছে। তাঁকে সম্মানিত করায় সরকারকে ধন্যবাদ।’
আইয়ুব বাচ্চু নিজের কানে এই খবর শুনলে কি করতেন, সেটিও যেন চোখের সামনে দেখতে পান ফেরদৌস চন্দনা, ‘খুশিতে কেঁদে দিতো। ও তো ভীষণ বাচ্চাসুলভ ছিল। তারপর হয়তো ছুটতো অফিসে, খাওয়া-দাওয়ার আসর বসিয়ে দিতো।’
সময়ের সঙ্গে ভক্তদের স্মরণও ফিকে হয়ে আসছে-এটিই চন্দনাকে বেশি কষ্ট দেয়, ‘সারাবছর ওকে স্মরণ করার চেষ্টা করি। তাঁকে যেহেতু ভাত রান্না করে খাওয়াইছি, তাঁর বাকি কাজগুলোও আমি করবো। তাঁর গানগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। পরিস্থিতি ঠিক হলে শুরুতে চট্টগ্রামের জেলা স্টেডিয়ামে এবং পরে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে তার স্মরণে দুটি কনসার্ট করতে চাই-এটুক আমার স্বপ্ন।’
নব্বই দশকের শুরুতে চন্দনাকে বিয়ে করেন আইয়ুব বাচ্চু। চট্টগ্রাম থেকে অভাবনীয় মেধা ও প্রতিভা সঙ্গে নিয়ে রাজধানী শহরে যাওয়া শিল্পী তখনো সংগ্রাম করছেন। সেই দিনগুলো মনে পড়ছে ফেরদৌস চন্দনার, ‘ও গান গাইতো আমি ঘর সামলাতাম। মানুষটাকে ভালোবেসে যেহেতু বিয়ে করছিলাম তাঁর সবকিছুই ভালো লাগতো। এখন আমি বড় একা। আমার সেই মন খারাপের কথা শোনার মানুষটাই তো নেই। আল্লাহর কাছে সবসময় বলি, মানুষটাকে ভালো রেখো।’
আইয়ুব বাচ্চুর গান চুরি করে অন্যরা নিজেদের নামে চালান তখন খুব কষ্ট পান চন্দনা, ‘ও কোনো সম্পদ গড়েনি। ওর সম্পত্তি ছিল গানগুলোই। সেগুলো যখন অন্যরা চুরি করে ব্যবসা করেন, দুঃখ লাগে।’
চার দশক আগে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে চট্টগ্রাম ছেড়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। এরপর গিটারে সুর তুলে, গান গেয়ে শিল্পী কাছে টেনেছেন দেশ-বিদেশের অগণিত শ্রোতা, ভক্তকে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে মৃত্যুর পর তিনি শেষবারের মতো ফিরে আসেন জন্মভ‚মিতে, কাঠের কফিনে। চৈতন্য গলি কবরস্থানে, মায়ের কবরের পাশেই তাঁর চিরদিনের ঠিকানা। চন্দনা তাই তো বললেন, ‘আপনারা চিটাগংবাসী ওর জন্য দোয়া করবেন। আপনাদের মাটিতেই তো ও শুয়ে আছে।’
আইয়ুব বাচ্চুর দুটি অমর গান চন্দনার জীবনের প্রতিশব্দ হয়ে গেছে এখন। দুঃখের দিনে স্বামীর সই দুই গানেই ডুবে থাকেন তিনি। গানগুলো হলো, ‘ভাঙা মন নিয়ে তুমি আর কেঁদো না’ এবং ‘সুখেরই পৃথিবী সুখেরই অভিনয়’। সেই দুই গানের প্রসঙ্গ টেনে চন্দনা বলেন, ‘আসলেই দুই সন্তানের জন্য ভাঙা মন নিয়েও আমি আর কাঁদতে পারি না। পৃথিবীতে সুখে থাকার অভিনয় করেই যেতে হচ্ছে।’
স্বামীর পদক পাওয়ার দিনে ফেরদৌস আক্তার চন্দনার বুকের শূন্যতা যেন নতুন করে তুললো হাহাকার।