
চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনের শঙ্খ নদীর উভয় পাড়ের মানুষের মাঝে নির্বাচনী উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। বিএনপি চায় আসনটি পুনরুদ্ধার, এলডিপি’র ছাতা প্রতীকের প্রার্থী ওমর ফারুক তার বাবা কর্নেল অলির আসনটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে ওঠেছেন। ইসলামী ফ্রন্ট চায় এ আসনে ভাগ বসাতে।
চন্দনাইশের ২ পৌরসভা, ৮ ইউনিয়ন ও পার্শ্ববর্তী সাতকানিয়ার ৬ ইউনিয়ন নিয়ে চট্টগ্রাম -১৪ সংসদীয় নির্বাচনী এলাকা গঠিত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপি, এলডিপি, ইসলামী ফ্রন্ট, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, ইনসানিয়াত বিপ্লব থেকে প্রার্থী হয়েছেন। এছাড়া মনোনয়নপ্রত্যাশী দুই বিএনপি নেতা কাক্সিক্ষত মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সবমিলে এ আসনে প্রার্থী হয়েছেন ৮জন।
নির্বাচনকে ঘিরে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে পথসভা, গণসংযোগ ও মাইকিংসহ নানামুখী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রার্থীরা। দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে প্রার্থীরা ঘুরছেন ভোটারের দ্বারে দ্বারে।
স্থানীয়রা বলছেন- এ আসনে আগামী নির্বাচনে জয়লাভ নির্ভর করছে প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা, দলের নিজস্ব ভোট ব্যাংক এর উপর। ইতোমধ্যে কর্নেল অলির ছেলে ওমর ফারুককে সমর্থন দিয়ে নির্বাচনী মাঠ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. শাহাদত হোসেন। যদিও তিনি দীর্ঘ এক বছর ধরে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় থেকে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে নিজের একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিলেন। কিন্ত মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলেও দলীয় সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে তিনি জমা দেননি।
এদিকে বিএনপি সমর্থিত দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে অবস্থান করার কারণে কিছুটা বেকায়দায় রয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী জসিম উদ্দীন আহমদ। বিএনপির প্রার্থী নিয়ে চন্দনাইশ বিএনপিতে বিভক্তি ও ক্ষোভের কারণে এ সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে দলের একটি সূত্র।
চট্টগ্রাম-১৪ আসনটি দক্ষিণ চট্টগ্রামে একটি আলোচিত আসন। এ আসনটি এক সময় বিএনপি’র ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। কর্নেল অলির হাত ধরে চন্দনাইশ ছাড়াও দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যান্য উপজেলায়ও বিএনপির বিস্তৃতি ঘটে। এ কারণে তিনি ১৯৮১ সাল থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৬ সালে বিএনপি থেকে বেরিয়ে তিনি লিবারেল ডেমোক্রোটিক পার্টি প্রতিষ্ঠা করে ছাতা প্রতীক নিয়ে একবার জয়লাভ করেন।
এদিকে কর্নেল অলি এলডিপি গঠন করার পর থেকে বিএনপি এই আসনে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। মামলা-হামলার শিকার হয়ে বেশকিছু নেতাকর্মী দলকে সুসংগঠিত করে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে আসেন। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারায় মূল ভোটযুদ্ধ হবে বিএনপির সাথে এলডিপি প্রার্থীর। প্রচারণায় পিছিয়ে নেই বৃহত্তর সুন্নি জোট সমর্থিত ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী মাওলানা সোলাইমান ফারুকী। তিনি পরপর তিনবার উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার কারণে এলাকায় তার নিজস্ব একটি বলয় তৈরি হয়েছে। এ আসনে অপর দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি এড. মিজানুল হক চৌধুরী (ফুটবল) ও দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিকুল ইসলাম রাহী (মোটর সাইকেল) প্রতীক নিয়ে বিরামহীন প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের কারণে টেনশনে আছেন বিএনপি প্রার্থী। এছাড়াও নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন জাতীয় পার্টি লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী বাদশা মিয়া, পাশাপাশি নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের প্রার্থী মো. আবদুল হামিদ, ইনসানিয়াত বিপ্লবের আপেল প্রতীকের প্রার্থী পটিয়া শান্তিরহাট এলাকার বাসিন্দা এইচ এম ইলিয়াছ।
জানতে চাইলে বিএনপি প্রার্থী জসিম উদ্দীন আহমদ পূর্বকোণকে বলেন, ‘নির্বাচিত হলে তারেক রহমানের ৩১ দফা বাস্তবায়নে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করবো। পাশাপাশি মানুষের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় গরু চুরি, পাহাড়ি এলাকায় অপহরণসহ সব ধরনের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি বন্ধে ভূমিকা রাখবো। নতুন প্রজন্মকে খেলাধুলায় মনোযোগী করতে স্টেডিয়াম, স্পোর্টস কাউন্সিল নির্মাণ করবো। বিশাল পাহাড়ি এলাকাকে নিয়ে এক গুচ্ছ পরিকল্পনা রয়েছে, যা নির্বাচন পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। পাহাড়ি এলাকা এগ্রো ইকোনমিক জোন, ট্যুরিজম, যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করা হবে।’
১১ দলীয় জোট প্রার্থী এলডিপির অধ্যাপক ওমর ফারুক পূর্বকোণকে বলেন, ‘নির্বাচিত হলে সাধারণ মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, বাসস্থান, সর্বোপরি মানুষের কল্যাণে কাজ করবো। এ আসনকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী করতে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। এলাকার যুব সমাজকে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিমুখী করতে পদক্ষেপ নেয়া হবে।’
ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী মাওলানা সোলাইমান ফারুকী বিজয় লাভ করলে দেশের সুিন্নয়ত কায়েমের মাধ্যমে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করবেন। পাশাপাশি মানুষের মৌলিক অধিকার, আইনি সহায়তা প্রদানে সংসদে দাবি তুলবেন বলে জানান।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লক্ষ ১৩ হাজার ৫১৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লক্ষ ৬৫ হাজার ৮৪৭ এবং নারী ভোটার এক লাখ ৪৭ হাজার ৬৬৫ জন। মোট ভোট কেন্দ্র ১০০টি এবং বুথ রয়েছে ৫৯৯টি।
বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়া প্রসঙ্গে শফিকুল ইসলাম রাহী পূর্বকোণকে বলেন, ‘গত ১৭ বছরে বিএনপির দুঃসময়ে চট্টগ্রাম-১৪ আসনে দলের সকল কর্মসূচি এবং নেতাকর্মীদের সামাজিক ও পারিবারিক আয়োজনে সম্পৃক্ত থেকেছি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনটি মামলার শিকার হয়েছি, করেছি কারাভোগও। এত কিছুর পরও উত্তর সাতকানিয়া সাংগঠনিক উপজেলা বিএনপির দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়নি। এমন কি দক্ষিণ জেলা বিএনপির কমিটিতেও আমাকে রাখা হয়নি। এরপর নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য আমরা ৬/৭ জন মনোনয়নপ্রত্যাশী সর্বাত্মক চেষ্টা করলেও কাউকেই মনোনয়ন না দিয়ে ভিন্ন মতের একজনকে প্রার্থী করা হয়।
দুঃখজনকভাবে, আমাদের সঙ্গে বসে বা ফোনে কথা বলে ন্যূনতম পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজনও মনে করেননি। তাই বাধ্য হয়ে আমি প্রার্থী হয়েছি। এরপর ২১ জানুয়ারি বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের প্যাডে, দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে আমাকে বহিষ্কার করা হয়। এই চিঠি পেয়ে আমি কষ্টের চেয়েও এক ধরনের তৃপ্তি অনুভব করেছি। কারণ দীর্ঘদিন দল থেকে কিছু না পেলেও অন্তত দলের প্যাডে আমার নাম লেখা একটি চিঠি পেয়েছি।’
পরিসংখ্যান মতে, ১৯৭৬ সালে চন্দনাইশ থানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এ আসনে ১৯৭৯ সালে ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মত প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন বিএনপি’র সাবেক নেতা ব্যারিস্টার মাহবুবুল কবির চৌধুরী। পরবর্তীতে তিনি রাষ্ট্রদূত হলে ১৯৮১ সালে উপ-নির্বাচনে তৎকালীন বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে ৭ মে তৃতীয় সংসদ, ১৯৮৮ সালে ৩ মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন জাতীয় পার্টির ইঞ্জিনিয়ার আফসার উদ্দিন আহমেদ। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ৫ম জাতীয় সংসদ, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ, একই বছর ১২ জুন ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে কর্নেল অলি জয়লাভ করেন। ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসন ছাড়াও সাতকানিয়া-লোহাগাড়া আসন থেকেও নির্বাচন করেন। নির্বাচনে তিনি দুটি আসনে বিজয়ী হন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) আসনটি ছেড়ে দেন। পরে উপ-নির্বাচনে তাঁর সহধর্মিণী মমতাজ অলি আওয়ামী লীগের প্রার্থী আলহাজ নজরুল ইসলাম চৌধুরীকে পরাজিত করে জয়লাভ করেন। পরবর্তীতে ২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় কর্নেল অলি নির্বাচিত হন। একই সালের বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের মেয়াদের শেষ দিকে কর্নেল অলি বিএনপি থেকে বেরিয়ে ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এলডিপি থেকে ‘ছাতা’ প্রতীক নিয়ে জয়লাভ করে ষষ্ঠবারের মতো জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন কর্নেল অলি। শত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে নিজ দলীয় প্রতীক ছাতা নিয়ে নির্বাচনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। কিন্তু প্রথমবারের মত নৌকার প্রার্থীর কাছে তিনি হেরে যায়। যদিও সারাদেশে এ নির্বাচন যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কর্নেল অলি জামায়াত ইসলামের সাথে জোটবদ্ধ হয়ে ১১ দলীয় জোটে তাঁর ছেলে অধ্যাপক ওমর ফারুককে প্রার্থী করেন। ছেলেকে প্রার্থী করলেও নির্বাচনী মাঠে তিনি গণসংযোগের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছেন।