আলোচনায় সমাধান মেলেনি, চট্টগ্রাম বন্দরে আংশিক ডেলিভারি শুরু

 নিজস্ব প্রতিবেদক

 চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দুবাইভিত্তিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে চলমান কর্মবিরতির মধ্যেই বৈঠকেও কোনো ফলপ্রসূ সমাধান আসেনি। তবে অচলাবস্থার মধ্যে আংশিকভাবে পণ্য ডেলিভারি কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যা রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত চালু থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক আজ রাত ৮টা–৯টা পর্যন্ত খোলা থাকবে এবং ৫ শতাংশ কাস্টমস কার্যক্রম চালু থাকবে।

আগামীকাল শুক্রবারও একইভাবে ৫ শতাংশ কাজ চলবে। পণ্য ডেলিভারি নিতে ইচ্ছুকদের কাজে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এদিকে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের দাবিতে ডাকা কর্মবিরতি ষষ্ঠ দিনে গড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিরসনে বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে বন্দর কর্তৃপক্ষের বোট ক্লাবে নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে শ্রমিক নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে শ্রমিক-কর্মচারীদের ১৪ সদস্যের প্রতিনিধি দল অংশ নেয়।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের নৌপরিবহন উপদেষ্টা বলেন, রোজার আগে পোর্ট বন্ধ করে এ ধরনের আন্দোলন অত্যন্ত অমানবিক ও অনুচিত। পোর্ট বন্ধ না করেও দাবিদাওয়া জানানো যেত। জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেবে না। পোর্ট বন্ধ থাকায় এভিয়েশন ফুয়েল আটকে আছে, যা এয়ারলাইনগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, কয়েকজন মানুষের জেদের কারণে ১৮ কোটি মানুষকে জিম্মি রাখা যাবে না, বিশেষ করে সামনে রোজা। গত তিন থেকে ছয় মাস ধরে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং একটি চুক্তির সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে তা কোন পর্যায়ে হবে, সেটি এখনো আলোচনার বিষয়।

আন্দোলনের পেছনে ‘কুচক্রী মহলের ইন্ধন’ থাকতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন উপদেষ্টা। তিনি বলেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে বন্দরে চাকরি করছেন, তাদের পোর্টের প্রতি দায়বদ্ধতা আরও বেশি থাকা উচিত। আন্দোলনকারীরা আলোচনায় আশ্বস্ত না হলে সরকার কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য হবে।

ধর্মঘটের ফলে হওয়া আর্থিক ক্ষতি নিরূপণে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন গঠনের কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি বিষয়টি উচ্চপর্যায়ে তুলে ধরে একটি নির্দিষ্ট কমিটির মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে, বন্দর রক্ষা সংগ্রাম ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব বলেই তারা বৈঠকে বসেছেন। তবে তাদের দাবি একটাই—ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করতে হবে। দাবি মানা হলেই কর্মবিরতি প্রত্যাহার করা হবে।

তিনি অভিযোগ করেন, নৌ উপদেষ্টা চুক্তির অর্থনৈতিক দিকগুলো সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন। আলোচনায় বিষয়গুলো তুলে ধরে বোঝানোর চেষ্টা করা হবে যে এ চুক্তি দেশের স্বার্থবিরোধী। সকালে নৌ উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনায় দেশবিরোধী কোনো চুক্তি হতে দেওয়া হবে না—এমন আশ্বাসও পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তিনি।

এর আগে সকালে নৌপরিবহন উপদেষ্টা ও বন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। সেখানে কোনো সমাধান না আসায় শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই দুপুরে উপদেষ্টা বন্দর ত্যাগ করলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা বিভিন্ন স্লোগান দেন।

বর্তমানে বন্দরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছে। বেশ কয়েকটি গেট বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের টার্মিনালে প্রবেশে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে রপ্তানিমুখী ১১ হাজারের বেশি কনটেইনার বন্দরে আটকা পড়েছে।

উপদেষ্টা সতর্ক করে বলেন, আন্দোলনকারীরা কাজে বাধা দিলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং পরবর্তী দিন সকালের মধ্যে বন্দর পুরোপুরি সচল হবে—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।