চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ভয়াবহ রূপ: সেপ্টেম্বরের চেয়ে অক্টোবর মারাত্মক, মৃত্যু বাড়লেও ৮০% নারী-শিশু

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম:

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসকে আক্রান্তের দিক থেকে ছাড়িয়ে গেছে অক্টোবর। এই দুই মাসেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৫ হাজার ৩৮ জন। অথচ বছরের প্রথম আট মাসে আক্রান্তের মোট সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২৩ জন। শুধু তাই নয়, এ বছর ডেঙ্গুতে মোট ৩৬ জনের মৃত্যুর মধ্যে ৩১ জনেরই মৃত্যু হয়েছে কেবল সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে।

নারী ও শিশুর মৃত্যু বেশি

স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে পুরুষ আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৩১৮ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৭ জনের। অন্যদিকে নারী আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ১৪৩ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। এছাড়া শিশু আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৭০০ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এ বছর ডেঙ্গুতে নারী ও শিশু মারা গেছে মোট ২৯ জন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৮০ শতাংশ।

চমেক হাসপাতালে রোগীর উপচে পড়া ভিড়, চরম দুর্ভোগ

সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাতের হার কমলেও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমছে না। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে স্থান সংকুলান না হওয়ায় বাধ্য হয়ে বেশির ভাগ রোগীকে বারান্দার মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, অনেক ডেঙ্গু রোগীর মশারি ও স্যালাইন স্ট্যান্ডের তীব্র স্বল্পতা রয়েছে। বহু রোগীকে বারান্দায় ওয়ার্ডের জানালায় ঝুলিয়ে স্যালাইন দিতে দেখা গেছে। ফ্যানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস করছেন রোগীরা। রোগীর স্বজনদের হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে দেখা যায়।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৮৭ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৩ জন, ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি হাসপাতালে ১৯ জন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ৭ জন, সিএমএইচ হাসপাতালে ২ জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ জন এবং বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ১৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ও পরামর্শ

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত দেশে জুন-জুলাই থেকে ডেঙ্গু বাড়ার প্রবণতা দেখা গেলেও সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে তা কমে আসে। কিন্তু এবার জুন-জুলাইয়ে রোগীর সংখ্যা কম থাকলেও আগস্ট থেকে তা বাড়তে শুরু করে এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে তা ভয়ংকর রূপ নেয়। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই ধারা চলতি নভেম্বর মাসেও অব্যাহত থাকতে পারে।

চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু রোগীর মূল চিকিৎসা হলো ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট। অনেকেরই এনএসওয়ান রিপোর্ট আসার সাথে সাথে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন পড়ে না। প্লাটিলেট কাউন্ট ১০ হাজারের নিচে নেমে গেলে বা অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ শুরু হলেই কেবল ক্রিটিক্যাল কেয়ার ম্যানেজমেন্ট লাগে। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্লাটিলেট নিয়ে অতিরিক্ত আতঙ্ক কাজ করে, যা কাম্য নয়। জ্বর কমে যাওয়ার পর প্লাটিলেট কমা শুরু হলে কিছু শারীরিক অসুবিধা দেখা দেয়, তখনই কেবল হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হতে পারে।

চমেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এ এস এম জাহেদ আজাদ বলেন, “ডেঙ্গু হলে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে হার্ট, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ ও গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা নিতে হবে। এখন জ্বর হলে সাধারণ ভাইরাস মনে করে বসে থাকা যাবে না, ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে। এ সময় পূর্ণ বিশ্রাম নিতে হবে, ভ্রমণ করা যাবে না এবং প্রচুর পরিমাণে তরল জাতীয় খাবার, ডাবের পানি, লেবুর পানি ও স্যালাইন খেতে হবে।”

চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, “ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। কোনো স্থানে যাতে তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।”

উল্লেখ্য, এর আগের বছরগুলোতে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর চিত্র ছিল—২০২৫ সালে মোট আক্রান্ত ৪ হাজার ৮৬৪ জন এবং মৃত্যু ২৭ জন; ২০২৪ সালে আক্রান্ত ৪ হাজার ৩২৩ জন এবং মৃত্যু ৪৫ জন; এবং ২০২৩ সালে আক্রান্ত ১৪ হাজার ৮৭ জন এবং মৃত্যু ১০৭ জন।