কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতকে ঘিরে ষড়যন্ত্রের জাল: অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ–এর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের নেপথ্য কাহিনি

লেখক মো. কামাল উদ্দিন- সাংবাদিক উন্নয়ন পরিষদ

কক্সবাজার—শুধু একটি শহর নয়, এটি বাংলাদেশের পর্যটন-স্বপ্নের প্রতীক। পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকতখ্যাত এই ভূখণ্ডকে ঘিরে দেশের অর্থনীতি, ভাবমূর্তি ও আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা একসূত্রে গাঁথা। আর সেই সম্ভাবনাকে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার যে দৃশ্যমান প্রয়াস গত কয়েক বছরে জোরদার হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কক্সবাজার টুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ। ঠিক এই সময়েই তাঁর বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিত অপপ্রচার, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভিডিও ছড়ানো এবং নামসর্বস্ব কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভিত্তিহীন সংবাদ প্রকাশ এসব প্রশ্ন জাগায়: কেন এখন? কার স্বার্থে? সমুদ্র সৈকতকে বদলে দেওয়ার প্রয়াস

গত কয়েক বছরে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতকে ঘিরে যে পরিবর্তন দৃশ্যমান, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। রাতের বেলায় টহল জোরদার, হোটেল-রিসোর্ট এলাকায় নজরদারি, অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মাদক লেনদেনের বিরুদ্ধে অভিযান, দখলদার উচ্ছেদ—এসব পদক্ষেপ পর্যটন শিল্পে নতুন আস্থা তৈরি করেছে। একসময় সৈকতের কিছু অংশ ছিল মাদক কারবারি, দালাল ও অসাধু চক্রের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। পর্যটক পরিবারগুলো সন্ধ্যার পর সৈকতে যেতে ভয় পেতেন। সেই পরিবেশ বদলাতে কঠোর অবস্থান নেন আপেল মাহমুদ। ফলাফল—সৈকতকে ঘিরে শৃঙ্খলা ফিরেছে, নিরাপত্তা জোরদার হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন নগরী গঠনের স্বপ্ন নতুন করে জেগেছে। স্বার্থান্বেষী চক্রের অস্বস্তি যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শক্ত হাতে মাদক ও দেহব্যবসার চক্রে আঘাত হানে, তখন সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে পড়ে সেই চক্রগুলোই। সৈকত দখল করে অবৈধ ব্যবসা চালানো গোষ্ঠী, নারী পাচার ও অনৈতিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত দালালচক্র, মাদক কারবারি—তাদের অর্থের উৎসে আঘাত পড়লে তারা নীরব থাকে না। সাম্প্রতিক সময়ে যে ভিডিও ও অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে, তা একটি সুপরিকল্পিত চরিত্রহননের প্রচেষ্টা—এমন ধারণা জোরালো হচ্ছে নানা মহলে। অভিযোগের ভাষা, প্রচারের কৌশল, একযোগে বিভিন্ন ফেইক আইডি ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়া—সব মিলিয়ে এটি স্বতঃস্ফূর্ত নয়, বরং সংগঠিত অপপ্রচার বলেই প্রতীয়মান। অভিযোগের রাজনৈতিক ও অপরাধী যোগসূত্র? কক্সবাজারে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় কিছু মাদক চক্রের বিরুদ্ধে টুরিস্ট পুলিশের ধারাবাহিক অভিযান কারও কারও আর্থিক স্বার্থে আঘাত করেছে। স্থানীয়ভাবে আলোচিত মাদক কারবারি শাহ আজম–এর নামও নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিভিন্ন ভিডিও প্রসঙ্গে। প্রশ্ন হচ্ছে—যে চক্রের অর্থের জোগান বন্ধ হয়ে গেছে, তারা কি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেনি? অভিযোগ উঠেছে, কিছু তথাকথিত সাংবাদিক ও নামসর্বস্ব সংবাদমাধ্যমও এই অপপ্রচারে যুক্ত সাংবাদিকতার নৈতিকতা যেখানে যাচাই-বাছাই, তথ্য-প্রমাণ ও দুই পক্ষের বক্তব্যের ওপর দাঁড়িয়ে, সেখানে যাচাই ছাড়া প্রচার কি উদ্দেশ্যমূলক নয়? একজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশের আগে ন্যূনতম অনুসন্ধান কি করা হয়েছিল? সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা বনাম অপসাংবাদিকতা আমি নিজে দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা, গবেষণা ও টেলিভিশন উপস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। পর্যটন শিল্প নিয়ে বই লিখেছি, দেশের ভাবমূর্তি রক্ষার প্রশ্নে বহুবার কলম ধরেছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলছি—কোনো অভিযোগ প্রকাশের আগে তদন্ত ও প্রমাণের প্রশ্নটি সর্বাগ্রে আসে। আজ আমরা দেখছি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে চরিত্রহননের ঝড় তোলা হচ্ছে। অথচ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, প্রশাসনিক তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ার কোনো ফলাফল সামনে আসেনি। এই তাড়াহুড়ো কি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী নয়? কেন এখন? এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যখন কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার উদ্যোগ জোরদার হয়েছে, যখন নিরাপদ পর্যটন নগরীর ধারণা বাস্তব রূপ নিতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই কেন এমন অভিযোগের ঢেউ? যে কর্মকর্তা দিন-রাত পরিশ্রম করে সৈকতকে অপরাধমুক্ত করার চেষ্টা করছেন, তাঁর বিরুদ্ধে নারী ও মাদক-সংক্রান্ত অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া—এটি কি কাকতালীয়? নাকি একটি সুপরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ, যাতে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয় এবং তিনি দুর্বল হয়ে পড়েন? রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ও পর্যটন শিল্পের প্রশ্ন কক্সবাজার শুধু একটি জেলার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড। এখানে কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেয়। পর্যটন শিল্পে নিরাপত্তা হলো সবচেয়ে বড় উপাদান। আর সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে যদি কোনো কর্মকর্তা চক্রের রোষানলে পড়েন, তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাঁকে আইনি ও নৈতিক সুরক্ষা দেওয়া।

ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন হোক আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই—যে কোনো অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত হোক। যদি কোনো প্রমাণ থাকে, আইন তার নিজস্ব পথে চলুক। কিন্তু প্রমাণহীন অপবাদ, ফেইক আইডি থেকে অপপ্রচার, নামসর্বস্ব পোর্টালে বিভ্রান্তিকর সংবাদ—এসব বন্ধ হোক। আপেল মাহমুদ–এর বিরুদ্ধে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তা কেবল একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নয়; এটি কক্সবাজারের নিরাপদ পর্যটন স্বপ্নের বিরুদ্ধেও আঘাত। আজ প্রয়োজন সত্য উদঘাটনের, গুজব নয়; দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার,অপসাংবাদিকতার নয়; ন্যায়বিচারের,চরিত্রহননের নয়। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার সংগ্রাম সহজ নয়। এই পথে বাধা আসবে, ষড়যন্ত্র হবে, অপপ্রচার ছড়ানো হবে—এটাই বাস্তবতা। কিন্তু সত্য শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে। যদি কোনো চক্র ভেবে থাকে, অপপ্রচার চালিয়ে একজন দৃঢ়চেতা কর্মকর্তাকে দমিয়ে দেওয়া যাবে—তবে তারা ভুল করছে। কারণ কক্সবাজারের মানুষ আজ সচেতন। তারা জানে, সৈকতের নিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কারা কাজ করছেন, আর কারা অন্ধকারে বসে জাল বুনছেন।

সত্যের পক্ষে, কক্সবাজারের পক্ষে, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের পক্ষে—এই কলম অবিচল থাকবে।