মোঃ সেকান্দর আলম চট্টগ্রাম
এক সময়ের ‘প্রাচ্যের রানি’ খ্যাত চট্টগ্রাম নগরী আজ পাহাড়ের ক্ষত, কর্ণফুলী নদীর কান্না আর খালের হাহাকারে তার রূপ হারাচ্ছে। নদী রক্ষা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে যুগের পর যুগ বহু প্রতিশ্রুতি, আদালতের কঠোর নির্দেশনা এবং কোটি কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা নেওয়া হলেও, মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের অভাবে বন্দরনগরীর পরিবেশগত সংকট দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
কর্ণফুলীর কান্না ও ২ হাজার অবৈধ দখলদার:
চট্টগ্রামের প্রাণ ও দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কর্ণফুলী নদী এখন অবৈধ দখলদারদের কবলে। বর্তমানে কর্ণফুলীর জমি দখল করে রেখেছে ২ হাজার ১১২ জন অবৈধ দখলদার। অন্যদিকে, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় কর্ণফুলী নদী দূষণের ৭৯টি নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭৭টি স্থানেই রয়েছে ভয়াবহ মাত্রার দূষণ। মূলত নগরীর ১৯টি প্রধান খালের মাধ্যমে প্রতিদিন গৃহস্থালি ও শিল্পের নানা ধরনের বিষাক্ত তরল এবং কঠিন বর্জ্য সরাসরি কর্ণফুলীতে গিয়ে পড়ছে, যা পরবর্তীতে মিশছে বঙ্গোপসাগরে।
খাল দখলে বাড়ছে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ:
চট্টগ্রাম নগরীতে একসময় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৩০টি খালের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ন, অবৈধ দখল আর ভরাট প্রক্রিয়ার কারণে এর অর্ধেকেরও বেশি খাল মানচিত্র থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে। বর্তমানে কাগজে-কলমে মাত্র ৫৭টি খালের অস্তিত্ব টিকে রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খালের জলপ্রবাহ ঠিক করতে এবং পুনরুদ্ধার করতে হাজার কোটি টাকার বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও, ভারী বর্ষণে নগরবাসীর জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ পুরোপুরি কাটেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না, জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি।
কংক্রিটের জঙ্গল ও বায়ুদূষণে কমছে গড় আয়ু:
নগরায়নের তীব্র চাপে চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত কমছে সবুজের সমারোহ, আর বাড়ছে ধূসর কংক্রিটের রাজত্ব। এর সাথে পাল্লা দিয়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বায়ুদূষণ। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের এয়ার কোয়ালিটি লাইফ ইনডেক্সের (একিউএলআই) একটি দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণ থেকে জানা গেছে, চট্টগ্রামে বর্তমানের এই বিপজ্জনক বায়ুদূষণ পরিস্থিতি যদি অব্যাহত থাকে, তবে এ অঞ্চলের মানুষের গড় আয়ু প্রায় ৬ বছর পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
সেবামূলক সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা ও সমন্বয়হীনতা:
চট্টগ্রামের এই বর্তমান পরিবেশগত বিপর্যয় ও নগর সংকটের পেছনে সংশ্লিষ্ট সেবামূলক সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা, অবহেলা ও সমন্বয়ের অভাবকে দায়ী করেছেন বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য এবং বিশিষ্ট হালদা ও পরিবেশ গবেষক অধ্যাপক ড. মো. মনজুরুল কিবরিয়া।
তিনি বলেন, “চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ১৯৯৫ সালে প্রণীত মাস্টারপ্ল্যান এবং পরবর্তী সংশোধিত পরিকল্পনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন আজও আলোর মুখ দেখেনি। পরিকল্পিত নগরায়নের পরিবর্তে এখানে অপরিকল্পিত উন্নয়নই সংকটকে আরও বাড়িয়েছে। এছাড়া, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বদলে এখনো সেই পুরোনো ম্যানুয়াল ও সুইপারনির্ভর ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ফলে যে বর্জ্যকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পদে রূপান্তর করা যেত, সেটি আজ নগরবাসীর জন্য অভিশাপে পরিণত হয়েছে।”
অধ্যাপক ড. কিবরিয়া আরও উল্লেখ করেন, “চট্টগ্রাম ওয়াসার নামের সাথে ‘সুয়ারেজ অথরিটি’ যুক্ত থাকলেও বাস্তবে এই কোটি মানুষের নগরীতে এখনো কোনো কার্যকর পয়ঃনিষ্কাশন বা সুয়ারেজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। যার ফলে নগরীর পয়ঃবর্জ্য সরাসরি নালা-খাল হয়ে কর্ণফুলী নদী ও সাগরে গিয়ে পড়ছে। পাশাপাশি দূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরের ভূমিকাও চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চট্টগ্রামের এই ত্রিমুখী সংকট—কর্ণফুলী রক্ষা, জলাবদ্ধতা মুক্তি এবং বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ করার সঠিক পথ ও কৌশল সবারই জানা। এই মহাবিপর্যয় থেকে চট্টগ্রামকে বাঁচাতে এখন শুধু প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ এবং কঠোর সদিচ্ছা।
মোঃ সেকান্দর আলম চট্টগ্রাম