মো : এরশাদ হোসেন চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) আওতাধীন বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালে নতুন ইজারাদার নিয়োগের পর থেকেই শুরু হয়েছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে প্রতিটি বাস থেকে নির্ধারিত ফির চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। আর এই অতিরিক্ত চাঁদা এড়াতে চালকেরা টার্মিনালে না ঢুকে সড়কের মোড়েই বাস ঘোরাচ্ছেন (ইউটার্ন), যার ফলে বহদ্দারহাট ও খাঁজা রোড এলাকায় প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট।
চালকদের মুখে চাঁদার সত্যতা:
টার্মিনালের ভেতরে বাস রাখা ঈগল পরিবহনের দুজন চালকের কথায় এই অতিরিক্ত চাঁদা আদায়ের সত্যতা পাওয়া গেছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বলেন, গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে টার্মিনালে গাড়ি রাখলেই জোরপূর্বক ১৩০ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় খাঁজা রোডের মুখের পাঁচ রাস্তার মোড়টিতে। সেখানে দক্ষিণ চট্টগ্রামমুখী বড় বড় দূরপাল্লার বাসগুলো ঘোরানো হলে সড়কের পাঁচদিকেরই গাড়ি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মুহূর্তের মধ্যেই পুরো এলাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। সরেজমিনে ওই মোড়ে এস আলম পরিবহনের একটি বাস ঘোরানোর সময় চালকের সাথে কথা বললে তিনি জানান, টার্মিনালের ভেতরে ঢুকলে দিতে হয় ১৩০ টাকা। এই অতিরিক্ত চাঁদা এড়াতেই মূলত তারা বাধ্য হয়ে সড়কের মোড়ে গাড়ি ঘোরাচ্ছেন।
লাঠিহাতে পাহারাদার বসিয়েছে নামহীন ইজারাদার:
বহদ্দারহাট বাস টার্মিনালটি সিডিএ এবার কাকে বা কোন প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দিয়েছে, তা জানেন না স্থানীয় পরিবহন শ্রমিক নেতা কিংবা সাধারণ শ্রমিকেরা। টার্মিনাল এলাকায় ইজারাদার কর্তৃপক্ষের কোনো অফিস বা সাইনবোর্ডও পাওয়া যায়নি। তবে পুরো টার্মিনাল নিয়ন্ত্রণ করছে তাদের একদল লাঠিয়াল প্রতিনিধি।
দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে টার্মিনালে প্রবেশের মুখে অবস্থিত বায়তুশ শরফ মসজিদের সামনে বিশেষ জ্যাকেট (ভেস্ট) পরা কিছু যুবককে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। তাদের সবার হাতেই রয়েছে পাইপের লাঠি। টার্মিনালে কোনো বাস ঢুকলে বা বের হলেই তারা লাঠি উঁচিয়ে গাড়ি আটকে ১৩০ টাকা করে চাঁদা আদায় করছে।
শ্রমিক নেতাদের উদ্বেগ ও বিশৃঙ্খলা:
এ বিষয়ে আরাকান সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মুছা বলেন, “বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল স্থাপনের পর থেকে সবসময় পরিবহন মালিক সমিতিই এটির ইজারা পেয়ে আসছিল। প্রতি দুই বছর পর পর ১০ শতাংশ অতিরিক্ত টাকা দিয়ে এই মেয়াদ বাড়ানো হতো। কিন্তু এই বছর মালিক সমিতিকে না দিয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত অন্যদের ইজারা দিয়েছে সিডিএ। তারা কারা আমরা জানি না, তাদের দেখাও পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু মাঠপর্যায়ে কিছু লাঠিয়াল লোক দেখছি। তারা গত পয়লা বৈশাখের পর থেকে প্রতিটি গাড়ি থেকে ১৩০ টাকা করে নিচ্ছে। গাড়ি ঘোরালেই নাকি এই টাকা দিতে হবে! অথচ আগে এই নিয়ম ছিল না। এসব কারণে টার্মিনালে একটি চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমরা চাই টার্মিনালে শৃঙ্খলা ফিরুক এবং গাড়ি যেন কোনোভাবেই প্রধান সড়কে রাখা না হয়।”
সিডিএ চেয়ারম্যানের বক্তব্য:
এ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নুরুল করিম স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, ইজারার শর্ত অনুযায়ী প্রতি গাড়িতে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তিনি বলেন, “এভাবে ১৩০ টাকা করে বাড়তি টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একই সাথে সড়কেও কোনো গাড়ি রাখা যাবে না। ইজারাদাররা যদি এই ধরনের অনিয়ম ও শর্তভঙ্গ করে থাকে, তবে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পরিবহন সংশ্লিষ্ট ও সাধারণ যাত্রীদের দাবি, দ্রুত এই অবৈধ চাঁদাবাজি বন্ধ করে বহদ্দারহাট মোড়কে যানজটমুক্ত করতে প্রশাসন যেন অবিলম্বে ব্যবস্থা গ্রহণ করে।