, মোঃ সেকান্দর আলম চট্টগ্রাম | ০৭ জুন, ২০২৬
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) শিক্ষিকা জুথির আকস্মিক ও রহস্যময় মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে নেমেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। তবে প্রাথমিক তদন্তের পর শিক্ষিকার মৃত্যুর কারণ নিয়ে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে। দেশের প্রচলিত প্রধান ২১টি প্যাথোজেনের ল্যাবরেটরি পরীক্ষার চূড়ান্ত রিপোর্ট সম্পূর্ণ ‘নেগেটিভ’ এসেছে। চিকিৎসকদের ধারণা, পার্বত্য অঞ্চলের কোনো অজ্ঞাত বা বিরল প্যাথোজেনের কারণে এই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
লক্ষণ ছিল ‘তীব্র মস্তিষ্কের প্রদাহ’, স্থানান্তরকালে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট
মৃত্যুর পূর্বে ওই শিক্ষিকার শরীরে ‘অ্যাকিউট এনসেফালাইটিস সিন্ড্রোম’ (AES) বা তীব্র মস্তিষ্কের প্রদাহের লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের পর আইইডিসিআর-এর একটি বিশেষ দল গত ১১ থেকে ১৪ মে পর্যন্ত চট্টগ্রামে মাঠ পর্যায়ে তদন্ত চালায়। এমনকি অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করার পথিমধ্যে তাঁর ‘কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট’ও হয়েছিল।
২১ নমুনার ফল নেগেটিভ, রোগটি ছোঁয়াচে নয়
আইইডিসিআর-এর চূড়ান্ত ল্যাবরেটরি রিপোর্টে দেখা গেছে, রোগীর রক্তের নমুনা থেকে জাপানিজ এনসেফালাইটিস, ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, নিপাহ এবং ইনফ্লুয়েঞ্জাসহ দেশের প্রচলিত ২১টি প্রধান প্যাথোজেনের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি।
কীটতাত্ত্বিক তদন্তে সিভাসু ক্যাম্পাসে মশার প্রজননস্থল পাওয়া গেলেও, জাপানিজ এনসেফালাইতিসের প্রধান বাহক ‘কিউলেক্স’ মশার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া মৃতের সংস্পর্শে আসা অন্য সবার ল্যাব টেস্টও নেগেটিভ এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগটি ছোঁয়াচে ছিল না, বরং এর উৎস ছিল একক এবং সুনির্দিষ্ট।
পার্বত্য অঞ্চলে ভ্রমণ ও অচেনা ভাইরাসের ধারণা
আইইডিসিআর-এর তদন্তে জানা গেছে, রোগাক্রান্ত হওয়ার ঠিক ২-৩ সপ্তাহ পূর্বে তিনি পার্বত্য জেলা বান্দরবান, মুন্সীগঞ্জ এবং চট্টগ্রামের কর্ণফুলী ইপিজেড এলাকা ভ্রমণ করেছিলেন। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, পার্বত্য অঞ্চলের গভীর বনাঞ্চল বা কোনো বিশেষ পরিবেশগত উৎস থেকে তিনি নতুন কোনো অজ্ঞাত জুনোটিক (প্রাণীবাহিত) ভাইরাস বা বিরল কোনো প্যাথোজেনের সংস্পর্শে এসে থাকতে পারেন।
“মেডিকেল বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটিকে আমরা ‘সিরোনেগেটিভ এনসেফালাইটিস’ বা কোনো বিরল অটোইমিউন রেসপন্স বলতে পারি। অনেক সময় এমন কিছু বিরল বা নতুন মিউটেশন হওয়া ভাইরাস থাকে, যা আমাদের দেশের প্রচলিত ল্যাব টেস্ট কিট বা প্যানেলগুলোতে ধরা পড়ে না। লক্ষণগুলো যেহেতু শতভাগ তীব্র মস্তিষ্কের প্রদাহের ছিল এবং রোগীর পার্বত্য অঞ্চলে ভ্রমণের ইতিহাস রয়েছে, তাই বনাঞ্চলে থাকা কোনো বিরল প্যাথোজেন বা জুনোটিক রোগের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এমন রহস্যময় কেসগুলোর ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে আরও উচ্চতর ‘নেক্সট-জেনারেশন সিকোয়েন্সিং’ করা প্রয়োজন।”
— ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাস, সহযোগী অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজ।
আইইডিসিআর-এর ৪ জরুরি সুপারিশ
দেশের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আইইডিসিআর তাদের প্রতিবেদনে চারটি জরুরি সুপারিশ করেছে:
দ্রুত নমুনা সংগ্রহ: সন্দেহজনক অ্যাকিউট এনসেফালাইটিস সিন্ড্রোম (AES) রোগীর ক্ষেত্রে ব্লাড, সিএসএফ (সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড) সহ প্রয়োজনীয় নমুনা দ্রুত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
সারভেইল্যান্স শক্তিশালীকরণ: ‘এইএস সারভেইল্যান্স’ এর নোটিফিকেশন, নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে।
বেসরকারি হাসপাতালকে নজরদারিতে আনা: বেসরকারি হাসপাতালসমূহকে কেন্দ্রীয় নজরদারির আওতায় অন্তর্ভুক্ত করে রোগী শনাক্তকরণ এবং রিপোর্টিং বিষয়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ: ‘জাপানিজ এনসেফালাইটিস’ ও অন্যান্য ভেক্টরবাহিত রোগের ঝুঁকি হ্রাসে মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।